প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি ও তৎকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া – কাজী জাহেদ ইকবাল

প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি ও তৎকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া [ কাজী জাহেদ ইকবাল ] : মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। পৃথিবীর যে কোনো জাতি যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করে তখন তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হয়, যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বা পরিচালনাকারী সরকারের বৈধতা থাকতে হয় এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রটির সাংগঠনিক প্রক্রিয়ারও সূত্রপাত হতে হয় এ সময়েই। এমনি একটি বৈধ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন, স্বীকৃতি ও রাষ্ট্র হিসেবে বৈধতা লাভ করে। বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এমনি প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই অগ্রসর হয়েছিল।

প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি ও তৎকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া - কাজী জাহেদ ইকবাল
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান

 

বর্তমান প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক আইনসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে বিচার করা হবে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা কালে বাংলাদেশ কীভাবে অগ্রসর হয়েছিল। একই সঙ্গে একটি সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল সেটিই বা কতদূর অগ্রসর হয়েছিল। ফলে প্রবন্ধের দুটি বিভাগ থাকবে, প্রথম ভাগে আমরা দেখব মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি এবং দ্বিতীয় ভাগে দেখব মুক্তিযুদ্ধকালে শুরু হওয়া সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা।

প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি :

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রবাসী সরকার হলেও তা ছিল জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত এবং একই সঙ্গে আইনানুগভাবে প্রতিষ্ঠিত। সরকারকে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানও বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের আইনি অবস্থান আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের আইনি অবস্থা বা স্বাধীনতাকামী একটি জাতির আইনি অবস্থানই আলোচনায় চলে আসবে। সরকারকে এখানে প্রতীক বা জাতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়েছে।

প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তিকে দুভাগে বিচার করা হবে। প্রথমত, দেখা হবে যে আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে প্রবাসী সরকার তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান কী ছিল এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ও আইনি প্রক্রিয়ায় এর অবস্থান কিভাবে স্বীকৃত হয়েছে।

 

ক. আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে:

আন্তর্জাতিক আইন হচ্ছে প্রথাগত ও চুক্তিগত আইনের সমষ্টি। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রসমূহ বিশ্বে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিজেদের সুবিধার জন্য কিছু প্রথা পদ্ধতি মেনে চলে। প্রথা, পদ্ধতি এবং চুক্তিভিত্তিক আইন হলেও সমকালীন বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনের কিছু বাধ্যকর ক্ষমতা বিদ্যমান। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান এবং এর অধীন আন্তর্জাতিক আদালত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের একটি সুসংবদ্ধরূপ দেবার চেষ্টা করা হয়েছে।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ

 

একই সঙ্গে বিভিন্ন কনভেনশন এবং বহুপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন অনেকটা সু-গঠিত রূপ পেয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রয়োজনে যে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতার ও অধিকারী। ফলে কোনো রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠীই যথেচ্ছ ভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে না বা নিয়ম বহির্ভূত কোনো আচরণ করতে পারে না।

একটি রাষ্ট্রকে বা জনসমষ্টিকে আত্মপ্রকাশ করতে হলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি লাভ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।” স্বীকৃতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন থাকা দুরূহ; কেননা স্বীকৃতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়, নিজ নিরাপত্তাসহ অনেক কিছুই জড়িত।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে সমকালীন বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রকে স্বাধীন হতে হলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রথা-পদ্ধতি, নিয়মকানুন মেনে তা অর্জন করতে হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হবার সময় বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত পন্থায় স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, বাংলাদেশ যুদ্ধে নেতৃত্বদানের জন্য একটি সরকার গঠন করে। এই সরকার বিশেষ কারণে বাংলাদেশের মুজিবনগরে শপথ নেবার পর দেশের বাইরে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করে। স্পষ্ট করে বললে ভারতে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রবাসী সরকার। তবে প্রবাসী সরকারের রাজধানী নির্ধারিত হয়েছিল মুজিবনগর যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসী সরকার শপথও নিয়েছিল এখানেই। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানের এই প্রক্রিয়া বিশ্বে নতুন নয়।

অনেকবারই দেখা গেছে নিকটবর্তী কোনো দেশে অবস্থান নিয়ে প্রবাসী সরকার তার কাজ পরিচালনা করেছে। বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ফ্রান্সের দ্য গল সরকার অবস্থান নিয়েছিলেন ব্রিটেনের লন্ডনে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো কম্বোডিয়ার প্রিন্স নরোদম সিহানুকের সরকার। সিহানুক সরকার দীর্ঘদিন চীনের বেইজিং ও থাইল্যান্ডে অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতর যুদ্ধ চালিয়েছেন এবং তার সরকার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ছিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্রবাসী সরকার পদ্ধতিটি একটি ব্যবহৃত কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্তত মৌন স্বীকৃতি এ বিষয়ে বিদ্যমান।

আন্তর্জাতিক আইন যে প্রথার উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সরকার পরিচালনার বিষয়টিকে সেই পর্যায়েই ফেলা যায়। সুতরাং বাংলাদেশ যে ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে তা কোনো ব্যতিক্রমী বা বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনুমোদনহীন পদ্ধতি ছিল না; বরং স্বীকৃত পথই ছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন ছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপর। এই সমর্থন পদ্ধতিটিকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দানেরই নামান্তর।

 

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্বের প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদের অবসান শুরু হলে স্বাধীনতাকামী দেশগুলোর পক্ষ নেবার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের উপর চাপ বাড়ছিল। বিশ্ব শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় জাতিসংঘ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সংঘ হিসেবে উপনিবেশবাদ বিরোধী অবস্থান নেয়।

১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৫১৪নং সিদ্ধান্ত অনুসারে উপনিবেশবাদ অবসানের পক্ষে অবস্থান নেয়। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বাধীনতা সংগ্রামরত বা স্বাধীনতাকামী জাতিসমূহের আকাঙ্ক্ষা ও কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছিল। ১৯৬০ সালের ঘোষণার পর সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সামনে স্বাধীনতার লড়াই করার একটি বৈধ অধিকার অর্জিত হয়।

দেখা যায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগেই সারা বিশ্বের বহু স্বাধীনতার সংগ্রাম বাস্তবতা লাভ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে তখনও ১৯৬০ সালের ঘোষণা তার পক্ষে ছিল। বিশ্ব সম্প্রদায় যৌক্তিকভাবে উপনিবেশ বিরোধী অঙ্গীকারের কারণে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সংগঠন হিসেবে প্রবাসী সরকার বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পেয়েছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে প্রবাসী সরকারের আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদিত ভিত্তি বিদ্যমান ছিল। প্রবাসী সরকার আন্তর্জাতিক ভাবে ঘোষিত অধিকারের ভিত্তিতে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বৈধ অবস্থান থেকে স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু করার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায় কর্তৃক প্রবাসী সরকার ও বাংলাদেশ উভয়ই স্বীকৃতি পেয়েছিল। একটি রাষ্ট্র কেবলমাত্র স্বীকৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সত্তা লাভ করে এবং আন্তর্জাতিক বিষয়বস্তু হিসেবে পরিগণিত হয়। যদিও সরকার ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিষয়ে কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। কিন্তু ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। স্বাধীনতাযুদ্ধরত একটি সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানেরই নামান্তর।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার সারা বিশ্বে কর্মকাণ্ড পরিচালনার যে সুযোগ পেয়েছিল বা বিশ্ব সম্প্রদায় দিয়েছিল তা প্রকৃতপক্ষে স্বীকৃতি প্রদান। স্বীকৃতির ৩টি বিষয় এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

  • প্রথমত স্বীকৃতির ব্যাখ্যা
  • দ্বিতীয়ত স্বীকৃতি দানের পদ্ধতি
  • এবং তৃতীয়ত স্বীকৃতির ফলাফল।

স্বীকৃতির বিভিন্ন তত্ত্ব ও প্রকারভেদ বিদ্যমান। তবে সহজে প্রকাশ করার জন্য এবং বর্তমান প্রবন্ধের প্রয়োজনে ‘আইনগত স্বীকৃতি’ (de Juri Recognition) এবং ‘কার্যত স্বীকৃতি’ (de facto Recognition) প্রক্রিয়া দুটির আলোচনাই প্রাসঙ্গিক হবে।

আইনগত স্বীকৃতি বা De Juri হচ্ছে স্বীকৃতিদানকারী রাষ্ট্র কর্তৃক সকল শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান। আর কার্যত স্বীকৃতি বা De facto স্বীকৃতি হচ্ছে স্বীকৃতি প্রদানকারী রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো রাষ্ট্র বা সরকারকে ভবিষ্যতের সকল শর্ত বা আপত্তির অধিকার বজায় রেখে সাময়িক এবং অস্থায়ী স্বীকৃতি প্রদানই হচ্ছে কার্যত বা De facto Recognition । কার্যত স্বীকৃতি সাধারণত প্রদান করা হয়। কার্যকলাপ ও আচরণের মাধ্যমে; আর আইনগত স্বীকৃতি প্রদত্ত হয় ঘোষণা প্রদানের মাধ্যমে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রথম আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নিকট থেকে। এর পর স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বেশ দ্রুতই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভে সক্ষম হয় বাংলাদেশ ও তার সরকার। এটি গেল স্বীকৃতির একটি দিক। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট থেকে কার্যত স্বীকৃতি লাভে সক্ষম হয়েছিল। কার্যত স্বীকৃতি পাবার কারণেই মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার সারা বিশ্বে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সক্ষম হয়েছিলেন।

সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত বাঙালি কূটনৈতিকরা পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করেন। এদের অনেকেই আবার বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনও শুরু করে দেন। কলকাতায় হোসেন আলী, ইরাকে আবুল ফতেহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনায়েত করিম, সৈয়দ আনোয়ারুল করিম এই প্রক্রিয়ার উদাহরণ।

শুধু তাই নয় জাতিসংঘসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা দেশের পক্ষে কাজ শুরু করেন। এমনকি জাতিসংঘে পর্যন্ত তদ্বির করা হয়। বিভিন্ন দেশে অফিস খুলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অর্থসংগ্রহ, প্রচার চালানো, জনমত গঠনসহ বিভিন্ন কার্য পরিচালনা করা হয়। কোনো দেশের সরকারই পাকিস্তানের আপত্তি গ্রহণ করে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়নি। ১০ এই সুযোগ প্রদানই প্রকৃতপক্ষে প্রবাসী সরকারকে কার্যত স্বীকৃতি প্রদান। ফলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার একই সঙ্গে কার্যত স্বীকৃতি এবং আইনগত স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।

স্বীকৃতির পদ্ধতিগত বিভাজন যেমন আছে তেমনি এর প্রকারভেদও বিদ্যমান। যেমন সরকারকে স্বীকৃতি, রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি, রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বীকৃতি প্রভৃতি, তবে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে বা একদম নবীন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সরকার ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রায় একই অর্থবহন করে।

১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে, পরিচালনা করতে দিয়ে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে প্রবাসী সরকারকে কার্যত স্বীকৃতি দিয়েছিল। সাধারণত প্রবাসী সরকার যখন নিজের দেশের অধিকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই অব্যাহত রাখে তখন তাকে বিভিন্ন দেশ কার্যত স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। অবশ্য ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার বা যুদ্ধে হেরে গেলে ঐ স্বীকৃতি আর বহাল থাকে না। ১২ বিপ্লব বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে স্বীকৃতির সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র ঐ দুটি বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় এখানে তা আলোচিত হলো না।

স্বীকৃতির গুরুত্ব বা আইনগত ভিত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভেতর মতভেদ বিদ্যমান থাকলেও আজকের বিশ্বে স্বীকৃতির আইনগত ভিত্তি এবং প্রয়োজনীয়তা রীতিমত প্রতিষ্ঠিত। স্বীকৃতির আইনগত ফল স্বীকৃতি লাভকারী ও দানকারী উভয় রাষ্ট্রের অধিকার, ক্ষমতা, অগ্রাধিকারকে দৈশিক ও আন্তর্জাতিক উভয় আইনের ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করে। ১৩ স্বীকৃতি না থাকলে আধুনিক বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে টিকে থাকাই এক কথায় প্রায় অসম্ভব।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠানে সদস্যপদ পেতে হলে স্বীকৃতি প্রয়োজন, কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সেই অর্থে সম্পর্কের জন্য স্বীকৃতি প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্বীকৃতি প্রয়োজন, এমন কি আন্তর্জাতিক আইনের কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও স্বীকৃতি জরুরি। ফলে স্বীকৃতি ছাড়া একটি রাষ্ট্রের পক্ষে টিকে থাকা যেমন প্রায় অসম্ভব তেমনি কঠিন।

১৯২১ সালে ইংল্যান্ডে এক মামলার মাধ্যমে স্বীকৃতির আইনগত গুরুত্ব পুরো পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। ঐ মামলায় ব্রিটিশ আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, সোভিয়েত সরকারকে কার্যত স্বীকৃতি প্রদানের কারণে তার জাতীয়করণ সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের নেই। সুতরাং স্বীকৃতির আইনগত ফলাফল খুবই পরিষ্কার।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ২
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

দেখা যাচ্ছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ যে প্রবাসী সরকার গঠন করেছিল তা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ নির্ধারিত কাঠামোর ভেতরই হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো একতরফা স্বাধীনতাও ঘোষণা করেনি রোডেসিয়ার (অধুনা জিম্বাবুয়ে) মতো। বরং সে আক্রান্ত হবার পর প্রথা পদ্ধতি মেনেই অগ্রসর হয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে। ফলে এই সরকার আইনানুগ ছিল একথা বলা যায়।

 

খ. বাংলাদেশের আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হবার পর স্বাধীনতা ঘোষণাপূর্বক তার কর্মকাণ্ড শুরু করে। স্বাধীনতা ঘোষিত হবার পর একটি সরকার গঠিত হয় এবং সে সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের বাংলাদেশের আইন ও সংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিচারে ভিত্তি কী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্বেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই শুরু করেছিল। ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ “শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচি আমাদের বাঁচার দাবি” শিরোনামে প্রকাশ করা হয়। * ছয়দফা ছিল স্বায়ত্বশাসন দাবির রূপরেখা। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতাহারে ৬ দফার উপর গণভোট হিসেবে আখ্যায়িত করে ভোট প্রার্থনা করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল প্রকৃতপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ছয় দফার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে ম্যান্ডেট।

১৯৭০ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ একটি ৩০ সদস্য বিশিষ্ট সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে ৬ দফা ভিত্তিতে খসড়া প্রণয়ন করেন। ৬ দফার স্বায়ত্তশাসন ধারণার সঙ্গে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের বিশেষ মিল বিদ্যমান। শেষ পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে একমত হতে না পারায় পাকিস্তানের ভাঙন অনিবার্য ছিল। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে। নিয়ে ঐ অবস্থান ত্যাগ করতে সক্ষম ছিল না। কেননা জনগণের ইচ্ছাই হচ্ছে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

শেষ পর্যন্ত যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে সামরিক হামলা চালানো হলো তখন স্বাধীনতা ঘোষিত হলো অনিবার্যভাবেই। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেবার জন্য যখন একটি প্রবাসী সরকার গঠিত হলো তখন সে সরকার দু’ভাবে আইনগত ভিত্তি লাভ করল; প্রথমত, সরকার গঠনকারী এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছিলেন স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৩
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

দ্বিতীয়ত, তারা স্বায়ত্তশাসন বা প্রয়োজনে স্বাধীনতার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জনগণের ম্যান্ডেটধারী। দ্বিতীয় বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। ৬ দফাতে যে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছিল তা ছিল স্বাধীনতার খুব নিকটবর্তী এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ঘোষিত একাধিক রাষ্ট্রের মূল সুর অনুসারী। এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ যখন খসড়া সংবিধানের রূপরেখা ঘোষণা করে তখন সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের সাব-ফেডারেশনের ধারণা বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ রাখা হয়।”

ধারণাটি নতুন নয় বরং ১৯৬৯ সালে আইয়ুবের নিকট খসড়া সংবিধানের রূপরেখা দেবার সময়ও এটিই দেয়া হয়েছিল। ফলে স্বাধীনতার একটি পরোক্ষ ইঙ্গিতও ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় জনগণের সামনে ছিল। সুতরাং প্রবাসী সরকারের পেছনে স্বাধীনতাকামী জনগণের স্পষ্ট ম্যান্ডেট বিদ্যমান ছিল। প্রবাসী সরকার যারা গঠন করেছিলেন তারা ছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধি। ১৯৭১ সালে একটি গণপরিষদ গঠন করা হয়েছিল।

* নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপর অর্পিত সাংবিধানিক ক্ষমতা বলেই প্রবাসী সরকার গঠিত হয়েছিল এবং প্রবাসী সরকার জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার হিসেবেই তাদের সকল দায়িত্ব আইনসম্মত ভাবে পালন করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট ছিল।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ইউসুফ আলী স্বাক্ষরিত গণপরিষদ কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে পরিষ্কারভাবেই প্রবাসী সরকারের ঘোষণা প্রদান করা হয়। ২০ সাধারণত যুদ্ধরত জনগোষ্ঠীর এমনি গণপরিষদই তাদের আইনানুগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। সুতরাং গণপরিষদের ঘোষণা ছিল উপযুক্ত আইনগত সংগঠনের ঘোষণা। গণপরিষদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সরকারের ঘোষণা প্রদত্ত হবার পর সেটিও আইনগত ভিত্তি লাভ করে। ঘোষণাপত্রে বলা হয় ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন হিসেবে চিহ্নিত হবে।

১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করার পর ঘোষণাপত্রে নির্দেশিত কাঠামোর সরকার গঠিত হয় ১১ এপ্রিল। ২১ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুজিবনগর নামক স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব লাভ করেন। সরকার শপথ নেয় প্রথা অনুসারে এবং তারা কাজ শুরু করেন আনুষ্ঠানিক ভাবে। সরকার ছিল রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির। ঘোষণাপত্রটি ছিল প্রকৃতপক্ষে সামিয়িক সংবিধান।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ঘোষণাপত্রে বর্ণিত ক্ষমতা বলে বিদ্যমান সকল আইন বৈধ করার জন্য এবং জনগণের ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের সংশোধনী আনার লক্ষ্যে একটি ‘আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ জারি করেন। এই আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ ও প্রবাসী সরকারের একটি আইনগত ভিত্তি ছিল। এর মাধ্যমে প্রবাসী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা লাভে সক্ষম হয়েছিলেন।

স্বাধীনতা উত্তর সময়ে প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তি দেশের সংবিধানের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বাংলাদেশের জনগণ কর্তৃক স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে ঐ সময়ের সকল কর্মকাণ্ডকে সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। ২৩ বাংলাদেশের সংবিধান তার জনগণ নিজেদের দিয়েছে এবং সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের ১ ধারা অনুসারে সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। ২৪ সুতরাং সে জনগণই যখন প্রবাসী সরকারের স্রষ্টা তখন তার আইনগত ভিত্তিস্পষ্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও মামলায় প্রবাসী সরকারের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে৫ এবং স্বীকৃত হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স কেলসেন তার গ্রন্থ General Theory of law and state-এ বিপ্লবের একটি আইনগত ভিত্তি উপস্থাপন করেছেন। তার ভাষায় বিপ্লব হচ্ছে সফল বিপ্লব। পরবর্তীকালে এই তত্ত্ব বিভিন্ন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় এবং সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও ব্যবহৃত হয়েছে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক। তবে এই তত্ত্ব সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক আইনের সময়। এই তত্ত্ব অনুসারে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনানুগ ও বৈধ। ফলে প্রবাসী সরকারও বৈধ আইনগত ভিত্তির অধিকারী।

একই সঙ্গে State necessity” তত্ত্বটিও যা উক্ত আদালত কর্তৃক স্বীকৃত, ” প্রবাসী সরকারের আইনগত ভিত্তির পক্ষে। এই তত্ত্ব অনুসারে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পালাবদল বা সেখান থেকে সরে আসা বৈধ। সুতরাং বিষয়টি বিশ্লেষণ করে একথা স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় উভয় আইনের প্রেক্ষাপটেই প্রবাসী সরকার আইনসম্মত। প্রবাসী সরকার প্রকৃতপক্ষে-ই কোনো নতুন বা অভিনব বিষয় নয়; বরং একটি স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠী বা নিজের ভূখণ্ড উদ্ধারে রত কোনো রাষ্ট্র আইন সমর্থিত ভাবেই এমনি প্রবাসী সরকার গঠন ও পরিচালনার অধিকার।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া :

সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলার আগে সংবিধানের সংজ্ঞা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। সংবিধান বলতে একটি দেশের সমগ্র সরকার ব্যবস্থা তথা যে অনুশাসনের সমষ্টি সরকার প্রতিষ্ঠা, নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করে। তাকে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়। ২৮ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানকে একমাত্র পবিত্র দলিল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সংবিধান যে কোনো পদ্ধতির রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য দলিল।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই একটি সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু যুদ্ধরত অবস্থায় একটি সংবিধান প্রণয়ন কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না। এমনি একটি অবস্থায় সবক্ষেত্রে যা করা হয় তা হচ্ছে একটি সাময়িক ব্যবস্থা নেয়া। এই সাময়িক ব্যবস্থাটি থেকেই শুরু হয় কোনো দেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশও এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একটি গণপরিষদে মিলিত হন। কেননা তাদেরকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে অধিবেশনে মিলিত হতে দেবার বদলে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন বা পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়া হয়নি। এই অবস্থায় বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম, গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠিত করেন। গণপরিষদের এই মিলিত হওয়া এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা করা দেশকে প্রথম সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদান করে।

গণপরিষদ তাদের আইনসম্মত ক্ষমতা বলে একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। এই ঘোষণাপত্র প্রকৃতপক্ষে ছিল সাময়িক সংবিধান। ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঘোষণাপত্রটি ছাড়া সরকার গঠন করা যেত না। সরকারকে আইনগত ভিত্তি দেবার ক্ষেত্রে এটি ছিল অত্যাবশ্যকীয়।” ঘোষণাপত্রের দিক নির্দেশনা অনুসারেই প্রবাসী সরকার পরিচালিত হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ অন্য একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল তবুও তার পূর্ববর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিকট কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। বরং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি নিজস্ব ক্ষমতা বলে তার একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি রচনা করেছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতিধ্বনিই শোনা যায় বাংলাদেশ সংবিধানের প্রস্তাবনার ভেতর।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারির মাধ্যমে যে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয় সেই প্রদত্ত ক্ষমতা বলে প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি ১০ এপ্রিল আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ জারি করেন। এই অধ্যাদেশটিও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটি অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক পদক্ষেপ। এই আদেশ বলে যে সকল চাকুরীজীবী বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য দেখাবেন তারা পূর্বশর্ত অনুসারে স্বপদে বহাল থাকবেন। এটি ২৬ মার্চ থেকে বহাল হবে মর্মে আদেশ দেয়া হয়।

আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ জারির ফলে প্রবাসী সরকারের সরকার পরিচালনা সম্ভব হয়েছিল। অন্যথায় প্রচুর জটিলতার সৃষ্টি হতো। যে সব কর্মচারী পক্ষ বদল করে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন সেটিও এই আইন ছাড়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া স্বাধীনতা উত্তর সময়েও অনেক আইনি জটিলতার সম্ভাবনা ছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে ‘আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ জারি করা ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছিল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তখন অন্তত চারটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। ৩

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎ করণ আদেশ-এর মাধ্যমেই অর্জিত সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকার পরিচালিত হয়েছিল। মূলত ঐ দুটিই ছিল মূল সাংবিধানিক কার্য। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে উচ্চ আদালতের ঐ দুই সাংবিধানিক কর্মই বিভিন্ন কারণে পর্যালোচিত হয়। সবগুলো ক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

‘দালাল আইন-১৯৭২’ এ. কে. এম ফজলুল হক কর্তৃক উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সরকার এবং পরবর্তীকালে জারি করা সাময়িক সংবিধানে প্রবর্তিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও তার কর্মের বৈধতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বিচারে আবেদনকারীর বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। ৪

অন্য একটি মামলায় আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ’-এর এখতিয়ারের বিস্তৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানেও বলা হয় অধ্যাদেশটি পূর্ববর্তী সকল আইনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এতে করে অধ্যাদেশটির বৈধতা যেমন স্বীকৃত হলো তেমনি এর বিস্তৃতিও নিশ্চিত হলো

উপসংহার :

২৬ মার্চ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর সংঘটিত প্রতিটি কার্যক্রম বিচার করে এ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, প্রবাসী সরকারের কর্মকাণ্ডসমূহ আইনসম্মত ছিল। প্রবাসী সরকার আন্তর্জাতিক আইন এবং দেশীয় আইন উভয় প্রেক্ষাপটেই সঠিক আইনগত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। একই সঙ্গে ঐ সময় যে সকল সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল তা ছিল যে কোনো সমলোচনার উর্ধ্বে। সুতরাং ‘ধ্রুপদী’ বিচারে প্রবাসী সরকার ও তৎকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

আরও পড়ুন:

তথ্যনির্দেশ :

1. L. Oppenheim: International Law A Treatise, vol-1, 8th Ed. p.4

২. The Charter of the United Nation, Chapter VII. Article 42

৩. J.G Strak- Introduction to International Law. 10th ed. (London: Butterworths. 1989) p. 131

৪. আজকের জাতিসংঘ, ঢাকা, জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র, ১৯৮৩, পৃ. ১২৭

৫. L. Oppenheim. প্রাগুক্ত, পৃ.

৬. J. GStrark, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১-৪২

৭. ঐ, পৃ. ১৪২

৮. কাজী জাহেদ ইকবাল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ১৯৭১-২০০১, ঢাকা, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০০২, পৃ. 2

৯. ঐ, পৃ. ২৫

১০. বিস্তারিত পাঠের জন্য দেখুন, আবু সাঈদ চৌধুরী, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৭: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, চতুর্থ খণ্ড, ঢাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮২

11. M P Tandor. Public International Law. Allahabad Law Agencey. Allahabad. 1992. P. 126-27

১২. ঐ, পৃ. ২২৭

১৩. J. G. Stark, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৬

১৪. A. M Luither Vs. James Sagor and Co. (1921) K.B. 3, P 532

১৫. ড. কামাল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল, ঢাকা, মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৮ পৃ.

16. AKM Shamsul Huda, Constitution of Bangladesh. Vol-1. Rita Court, Chittagong, 1997. P. 163

১৭. ড. কামাল হোসেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫

১৮. মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৬,

19. The Proclamation of Independence

২০. ঐ

২১. A.K.M. Shamsul Huda, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮১

২২. মওদুদ আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২০

২৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা

২৪. Justice Mustafa Kamal, Bangladesh Constitution: Trends and Issues, University of Dhaka, Dhaka, 2001. P. 4-5

২৫. A.K.M Fazlul Haque Is State 26 DLR (SC) P.11

২৬. State Vs Dosso. PLD 1958 (SC) 533

২৭. PLD 1955 (FC) 435. N. Bhutto Vs. The Chief of Army Staff and the Federation of Pakistan PLD 1977 (SC) 657

২৮. কে সি হোয়ের (অনুবাদ আজিজুর রহমান চৌধুরী), আধুনিক সংবিধান, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৭৮, পৃ. ১

২৯. PDL 1963 (DHC) 664 1-710

৩০. The Proclamation of Independence ৩১. মওদুদ আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৯

৩২. Justice Mustafa Kamal, প্রাগুক্ত, পৃ. ০৮

৩৩, ঐ, পৃ. ৪৮

৩৪. A.K.M. Fazlul Haque Vs. State, 26 DLR (SC) 11

৩৫. Dulichand Omaro Lal Vs. Bangladesh. 33 DLR (AD) 30

Leave a Comment