মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী – সত্যজিৎ রায় মজুমদার

মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী [ সত্যজিৎ রায় মজুমদার ] : একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনগণের সাথে প্রশিক্ষিত বাহিনীর মধ্যে সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের সাথে আনসার বাহিনীও সক্রিয়ভাবে করে। পৃথিবীর খুব কম দেশেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা লাভের ঘটনা ঘটেছে। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ-পীড়নের প্রতিবাদে বাংলাদেশের গণমানুষের সাথে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি করা যায়। এক্ষেত্রে আনসার বাহিনীরও বিশেষ অবদান স্বীকৃত।

মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী - সত্যজিৎ রায় মজুমদার - মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও প্রতিরোধপর্বে আনসার সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এ পর্যন্ত অনুসারে একাত্তরে তাদের প্রায় সাত সদস্য শাহাদাত বরণ আনসার বাহিনীর এবং যুদ্ধাহত জীবিত আছেন। তবে যতই অবদান থাকুক না কেন তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের যথার্থ ইতিহাস এবং পরিসংখ্যান এখনও রচিত হয়নি এবং দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে তা সম্পন্ন করা অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

একাত্তরপূর্ব আনসার বাহিনীর ইতিহাস: 

ইসলাম প্রচারকালে হযরত মোহাম্মদ গমন করেন। সময় বিরোধীদের আক্রমণ থেকে তাঁদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তাঁরা ‘আনসার’ পরিচিত হন। তাঁদের অনেক সময় ‘আনসার-আল নবি নবির সাহায্যকারী নামেও অভিহিত করা হতো। আরবি ‘আনসার’ অর্থ সাহায্যকারী। এই আনসারদের নাম অনুসারে ব্রিটিশমুক্ত নবগঠিত পাকিস্তানে ১৯৪৮ ১২ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত হয় ‘আনসার বাহিনী,’ যা ছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট ভারত বিভাগের পর নব গঠিত পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে নানা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা দেখা দেয়।

বড় সমস্যা হিসেবে ভারত থেকে আসা মোহাজেরদের পুনর্বাসন। সব সমস্যা সমাধানের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সাথে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা দেয়। প্রয়োজন থেকে গঠিত হয় বাহিনী। এই প্রথম পরিচালক ছিলেন জেমস বুকানন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলা সরকারের ইংরেজ কর্মকর্তা শরীরচর্চা বিভাগের পরিচালক। তিনি অপশন ঢাকা এলে উপর বাহিনী গঠনের দায়িত্ব অর্পণ হয়। বাহিনীর নামকরণ করেন তৎকালীন শিক্ষাসচিব এফ রহমান।

আনসার বাহিনী গঠনের প্রধান লক্ষ্য :

১.দেশরক্ষায় সামরিক বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা।

২.আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশকে সহায়তা করা।

৩.পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ।

ঢাকার বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে সন্নিহিত পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত এলাকায় তৎকালীন আনসার পরিদপ্তর স্থাপিত হয়েছিল। প্রথমে আনসারদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা ছিল না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণ আরম্ভ হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা বিশেষ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল ১৯৪৮-৪৯ সালে। তখন নতুন স্বাধীনতা প্রাপ্তির আবেগে দেশরক্ষার জন্য দলে দলে মানুষ আনসার বাহিনীতে যোগ দেয়। তাদের ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ চলেছিল। তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। এরপর থেকে ইউনিয়ন ভিত্তিক আনসার সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রথমে একটি, পরে তিনটি করে প্লাটুন গঠিত হয় প্রত্যেক ইউনিয়নে। ওই সময় বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্যকে রাইফেল প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তখন আনসারদের নিজস্ব রাইফেল ছিল না। ১৯৪৯ সালে শীতকালীন প্রশিক্ষণসূচির অধীনে ৬৩ হাজার সদস্য রাইফেল প্রশিক্ষণ পান।

পশ্চিম পাকিস্তানি প্রশাসন প্রথম থেকেই যে বাঙালিদের ভালো চোখে দেখেনি তার প্রমাণ আনসার বাহিনী থেকেও পাওয়া যায়। ১৯৫১ সালে আনসার বাহিনীর কিছু দাবি পূরণ করে আকস্মিকভাবে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে কেনা ৪২ হাজার উন্নত রাইফেল তাদের জন্য বরাদ্দ হয়। তবে তিন-চার বছরের মধ্যে কৌশলে সেগুলো তুলে নিয়ে প্রায় অকেজো ৩০৩ রাইফেল প্রতিস্থাপন করা হয়।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান

 

বাঙালি সমৃদ্ধ আনসার বাহিনীর অগ্রগতি এবং অস্ত্রপ্রশিক্ষণ পাকিস্তান সরকার সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এজন্য বাঙালি মহাপরিচালক এএইচএমএস দোহার পরিবর্তে উগ্র মেজাজের পাঞ্জাবি মহাপরিচালক নওশের খানকে নিয়োগ দিয়ে এখানে পাঠানো হয়। তার কাজ ছিল আনসার বাহিনীর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা এবং গোপনে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে এদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত করা। তবে, ১৯৫২ সালে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তখন অপরিহার্যভাবে আনসার সদস্যসংখ্যা চার লাখ থেকে উন্নীত হয় চৌদ্দ লাখে।

দেশ বিভাগের পর ১৯৫২ সালের ঘটনাপ্রবাহ খুব দ্রুত বাঙালির স্বাধীনতা লাভের দিকে মোড় নিতে শুরু করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করার সময় সালাম, রফিক, জব্বারসহ কয়েকজন শহিদ হন। এদের মধ্যে জব্বার ছিলেন আনসা কমান্ডার। এতে পুরো বাহিনীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয় কিন্তু তারপরও সরকার আনসার বাহিনীকে বাঙালিদের বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করে। ফলে তাদের সাথে জনগণের কিছু সংঘর্ষ ঘটে। কিন্তু নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে তারা আক্রমণ চালাতে চায়নি। এতে চৌদ্দ লাখ থেকে আনসার সদস্যসংখ্যা চার লাখে নেমে আসে এবং এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় শত শত আনসার সদস্য।

অসহযোগ ও গণআন্দোলনে আনসার বাহিনী:

মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর অবদান ঊনসত্তরের গণআন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করা যায়। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি পেশাগত কারণেও তারা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আনসার বাহিনী গঠনের অল্পকাল পর থেকেই সরকার তাদের হীন চক্রান্তের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে তৎপর হয়ে ওঠে। সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ দিয়ে বাঙালি আনসারদের দক্ষ ও উপযুক্ত করে গড়ে তোলার বিপক্ষে ছিল তারা।

উল্লেখ্য ১৯৫৫ সালের আগে আনসার বাহিনী ছিল অস্থায়ী এবং ১৪ লক্ষ আনসারের জন্য বার্ষিক বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৪ লক্ষ টাকা। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া বিজয় অর্জন করে। একাত্তরের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে ১ মার্চ এক ঘোষণায় তা স্থগিত করা হয়। এতে সারা বাংলার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় দুর্বার আন্দোলন।

১ মার্চ থেকে ঢাকায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। জেলা, মহকুমা পর্যায়েও দ্রুত এর শাখা কমিটি গঠিত হয়। সাথে সাথে স্বাধীনতার পক্ষের সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এদের উদ্যোগে দেশের সর্বত্র আগ্রহী ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়। এদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব অনেকাংশে বহন করেন প্রশিক্ষিত আনসার সদস্যরা। তখন বাঙালি সেনারা ব্যারাকে অবরুদ্ধ থাকায় অবসরপ্রাপ্ত এবং পালিয়ে আসা পুলিশ, ইপিআর ও আনসাররা প্রশিক্ষণের বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

সৌভাগ্যবশত এ সময় মহকুমা পর্যায়ে দুইশ জন আনসারের দুই মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। অন্যদিকে একটি বিশেষ সতেজকরণ প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হয়। এর ফলে তাদের হাতে বেশি সংখ্যায় ৩০৩ রাইফেল ও গুলি চলে আসে। তারা এ সব অস্ত্র নিয়ে স্বাধীনতাকামী জনগণকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। একাত্তরে বাংলাদেশের বড় বড় কল-কারখানায় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। শ্রমিকরা রাজনৈতিক সচেতনভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়। এসব কারখানার নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিল আনসার বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তারা প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এ সময় বিভিন্নভাবে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা চলে। ওই সময় আনসারদের সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার। অস্ত্র হস্তগত করার গোপন তৎপরতার অংশ হিসেবে শীতকালীন প্রশিক্ষণ পিছিয়ে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়। প্রাদেশিক পর্যায়ে ঢাকার সাভারে দুই হাজার আনসারের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয় যেন প্রয়োজনে তারা অন্যান্য বাহিনীর সাথে মিলে পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবেলায় যুক্ত হতে পারে।

বাংলা ভাষায় ছাড়া প্রশিক্ষণ যথার্থ হবে না অজুহাতে ওই প্রশিক্ষণে সেনাবাহিনী থেকে শুধু বাঙালিদের একটি প্রশিক্ষক দল বাছাই করা হয়। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন আর্টিলারি কোরের লে, আলাউদ্দিন। তবে পাকিস্তানি সামরিক শাসক ষড়যন্ত্র করে তাদের নিরস্ত্র করার উপায় খুঁজতে থাকে। সাভার, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণরত আনসারদের কাছ থেকে পাকিস্তানি সেনারা রাইফেল জব্দ করে নিয়ে যায়। এজন্য আনসারদের ব্যবহৃত ৪২ হাজার রাইফেল তাদের নিজেদের আয়ত্তে নেওয়ার এবং মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা ছিল তাদের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

এগুলো জেলা এবং মহকুমা পুলিশ কোতে সংরক্ষিত থাকত। নিজেদের আয়ত্তে নেওয়ার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক আদেশ জারির মাধ্যমে রাইফেলগুলো থানা ও গ্রামের আনসারদের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আদেশ জারির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন আনসার বাহিনীর তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. জহুরুল হক। তিনি আমার স্মৃতিতে আনসার’ গ্রন্থে বলেছেন:

“আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্বাধীনতাসংগ্রামে ৪২ হাজার রাইফেলধারী আনসারদেরকে পাকিস্তান বাহিনী কোনদিন গ্রামেগঞ্জে ঢুকে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হবে না এবং তারা এই অস্ত্রবলে কোন না কোনভাবে অন্তত গেরিলা পদ্ধতিতে পাকিস্তানকে পরাভূত করতে পারবে।”৬

পাকিস্তান সরকার উপলব্ধি করলেও বাংলাদেশে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু তখন এক বড় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসীন হয়েছিলেন। আনসারদের অস্ত্র সম্পর্কে রাও ফরমান আলী খান বলেছেন, প্রশাসনের উপর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ থাকাকালে পুলিশের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত রাইফেল মুজাহিদদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল।

এক গোপন পরিকল্পনার আওতায় ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে সিগন্যালের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অধিক সংখ্যক আনসার নিয়োগের সুযোগে তাদের মধ্যে অস্ত্র বন্টন করা হয়। এভাবে গ্রামীণ এলাকায় রাইফেল পৌঁছে যাওয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলনকারীরা উৎসাহিত হয় এবং প্রশিক্ষণ জোরদার হয়ে ওঠে।

সাভারে প্রশিক্ষণরত আনসাররা পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এজন্য তারা রাতে বাইরে থাকার অনুমতি গ্রহণ করে। আক্রান্ত হলে তাদের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ এড়িয়ে যেতে বলা হয়। ৭ মার্চের পর অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে কোথাও কোথাও আনসারদের প্রশিক্ষণ চলছিল। তাদের প্রশিক্ষণ স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান রক্ষায় ব্যবহৃত হবে মনে হওয়ায় কিছু ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ বাঁধে সংগ্রামী জনতার সাথে।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেও প্রশিক্ষণ চালু রাখার আদেশ জারি করে। ১৭ মার্চ মো. জহুরুল হক আনসারের দুইজন সহকারী পরিচালক ও একজন জেলা অ্যাডজুটেন্টকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে দেখা করেন। তিনি আনসারদের যে কোন অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন এবং কোন অস্ত্র যেন হাতছাড়া না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।

একাত্তরের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস’-এ বঙ্গবন্ধু নিজের বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। তখন প্রতিটি ভবনে কালো পতাকার সাথে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। জেলা ও মহকুমা শহরে পতাকা উত্তোলন উপলক্ষ্যে গার্ড অব অনার অনুষ্ঠানগুলোতে কুচকাওয়াজ প্রদর্শনে আনসারদের বড় ভূমিকা ছিল।

প্রতিরোধসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী :

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়, জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কে প্রতিরোধপর্ব বলা যায়। এ সময়ের প্রতিরোধ ছিল অনেকটা অপরিকল্পিত এবং সমন্বয়হীন। তবে এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এ সময় বাঙালি যোদ্ধারা অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে। তখন প্রতিরোধসংগ্রামেও আনসার বাহিনীর সদস্যরা সাফল্যজনকভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে দেশ জুড়ে তাদের সম্পৃক্ততার সার্বিক চিত্র বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল সেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর বিষয়ে ষোলোটি পরিচ্ছেদে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রতি জঘন্য নির্দেশাবলি লিখিত ছিল। ঢাকায় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খান এবং ঢাকার বাইরে এর সার্বিক দায়িত্বে ছিল মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা।

অপারেশন সার্চ লাইটের ভিত্তি ও পরিকল্পনায় অত্যন্ত নগ্নভাবে বাঙালিদের হত্যা ও নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা ছিল। সিক্যুয়েন্স অব অ্যাকশান’ সাব হেডিংয়ের ১২ নম্বরের ডি ধারায় ছিল All Ansar Rifels to be got hold of.১০

২৫ মার্চের আক্রমণে রাজারবাগ পুলিশলাইন, পিলখানার ইপিআর হেড কোয়ার্টার, বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি আক্রান্ত হলেও আনসার পরিচালন দফতরে হামলা হয়নি। অন্যদিকে সাভারে প্রশিক্ষণরত দুই হাজার আনসারকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে উপস্থিত হলেও আগে থেকে এমন সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে তারা নিরাপদ স্থানে সরে যায়। পরে তারা অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের সাথে যুক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণে খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, যশোর, নওগাঁ প্রভৃতি স্থানে হতাহত হয় বহু পাকিস্তানি সেনা। ক্যান্টনমেন্টের মতো বিশেষ এলাকা ছাড়া দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল সাময়িকভাবে দখলে নেয় মুক্তিযোদ্ধারা।

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

প্রতিরোধযুদ্ধে যে সব স্থানে আনসাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে যশোর অন্যতম। সেখানে চার স্তরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় মুক্তিফৌজ, ইপিআর বা সামরিক বাহিনী, মুজাহিদ বা আধা সামরিক বাহিনী এবং আনসার। ১ যশোর জেলা অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন আবুল হোসেন। ৩০০ রাইফেল, প্রচুর গোলাবারুদ দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মহকুমা অ্যাডজুটেন্ট খান আতিয়ার রহমানও রাইফেল ও গোলাবারুদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। এ খবর জানাজানি হলে ২৯ এপ্রিল তাঁকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। নড়াইলে আনসারের মহকুমা অ্যাডজুটেন্ট শেখ আজিজুর রহমান ছিলেন দেশপ্রেমিক। তিনি নিজ অস্ত্রাগারের ৩০০ রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের বিতরণ করেন তাঁকেও ধরে নিয়ে ২ এপ্রিল হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

সারা দেশের প্রতিরোধসংগ্রামে আনসারদের ভূমিকার মধ্যে চট্টগ্রাম ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সেখানে প্রতিরোধযুদ্ধের সূচনা ঘটে। ২৮ ফেব্রুয়ারি এম ভি সোয়াত ভর্তি বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বন্দরের জেটিতে নামাতে বাধা প্রদানে বড় ভূমিকা রাখে আনসাররা। এর আগে ২৬ মার্চ থেকে পটিয়ার এক প্লাটুন আনসার কালুরঘাট ব্রিজের পূর্ব পাড়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে অবস্থান করছিল। ১২

চট্টগ্রাম শহরের আনসাররাও প্রস্তুত হয়েছিল। সে সময় চট্টগ্রামের জেলা অ্যাডজুটেন্ট মোস্তাক হোসেন চৌধুরী। তিনি তাঁর অফিসার এবং অধীনস্থদের স্বাধীনতার পক্ষে তৈরি করে রাখেন। এছাড়া ক্যাজুয়ালটি রিজার্ভ বাহিনীতে থাকা দেড়শ আনসার বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইপিআরদের সাথে যোগ দেয়। কক্সবাজার মহকুমার আনসার অ্যাডজুটেন্ট রহিমদাদ চৌধুরীর নির্দেশে অনেক সদস্য চট্টগ্রামে মোস্তাক হোসেন চৌধুরীর কাছে রিপোর্ট করে এবং পরে তাদের সাথে মিলিত হয়। স্থানীয় আরও আনসার সদস্য প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।

এরপর শহরের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে আনসাররা দামপাড়া পুলিশলাইনের প্রতিরোধযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করে। ভাটিয়ারিতে ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে যে যুদ্ধ হয়, তাতেও আনসার সদস্যরা অংশ নেয় এবং শহিদ ছয়জনের মধ্যে আনসার বাহিনীর সদস্য ছিলেন তিনজন। ১৩ কুমিরার যুদ্ধটিও অন্যতম গুরুত্বের দাবিদার।

২৭ মার্চ কুমিল্লার ৫৩ ব্রিগেডের একটি বড় পাকিস্তানি সেনাদল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাম্বুশ করে তাদের উপর আক্রমণ করে এবং এ যুদ্ধে শতাধিক আনসার অংশগ্রহণ করে। এখানে শহিদ ১৪ জনের মধ্যে ৬ জন আনসার। চট্টগ্রামে কালুরঘাট যুদ্ধেও আনসারদের ভূমিকা ছিল। কালুরঘাট ইস্পাহানী জুট মিলের আনসার কোম্পানি প্রতিরোধযুদ্ধে জড়িত হয়।

কক্সবাজার প্রতিরোধযুদ্ধের শুরু হয় ইপিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে। এখানে বাঙালি ইপিআররা অবাঙালি ইপিআরদের বন্দি করার অতর্কিত অভিযানে আনসাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্যে এগিয়ে আসে। সহকারী অ্যাডজুটেন্ট জাফর আলম ও রওশনুজ্জামানের নির্দেশে ২৫ মার্চ রাতে কমান্ডার মুজিবর রহমানসহ অনেক আনসার এ অভিযানে অংশ নেয়। স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে আনসার বাহিনীর যারা তৎপরতা চালিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন আনসার প্রশিক্ষক আবদুল আজিজ, মফিজুর রহমান, মোহাম্মদ হোসেন, কমান্ডার আবু তাহের মাসুদ প্রমুখ।

কুষ্টিয়ার যুদ্ধে আনসারদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। আনসার বাহিনীর আলমডাঙ্গা সার্কেল আবুল কাশেম ও দর্শনা সার্কেলের সহকারী অ্যাডজুটেন্ট মো. আবদুল হান্নান বিভিন্ন এলাকার আনসারদের সংগঠিত করার ভূমিকা রাখেন। রাজনৈতিক নেতাদের পরিচালনায়ও আনসাররা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। এদিকে চুয়াডাঙ্গা দক্ষিণ পশ্চিম রণাঙ্গনের সদর দপ্তর ঘোষিত হয়। ফলে এর চারদিকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা গৃহীত হয়। পরে কুষ্টিয়া দখলের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আবু ওসমান চৌধুরী বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি পুলিশ আনসার ও মুজাহিদদের আমার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করি। স্থানীয় পুলিশ ও আনসারদের ৩০৩ রাইফেলগুলো দ্বারা এই বাহিনীকে সজ্জিত করি।

এই অভিযানে দুই কোম্পানি আনসার অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয়। আনসার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মহকুমা অ্যাডজুটেন্ট তোফাজ্জল হোসেন, আনসার প্রশিক্ষক খোন্দকার আনোয়ারুজ্জামান, মনসুর মিয়া ও জামালউদ্দিন। কথা অনুসারে তারা ২৭ মার্চের মধ্যে ৩০০ প্রশিক্ষিত আনসার সদস্য নিয়ে আলমডাঙ্গা থানা পরিষদে উপস্থিত হন। চুয়াডাঙ্গায় শীতকালীন প্রশিক্ষণ না থাকায় অস্ত্র ছিল পুলিশ ট্রেজারিতে। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সে অস্ত্র উদ্ধার করেন আব্দুল হান্নান। এই অভিযানে একটি আত্মঘাতী দল গঠিত হয়েছিল।

 

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৩
মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

 

স্বেচ্ছায় যারা নাম লেখান তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন আনসার। প্রশিক্ষক খোন্দকার আনোয়ারুজ্জামান তাদের অন্যতম। ওই সময় মেহেরপুরের সহকারী আনসার অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন মো. আয়েন উদ্দিন মিয়া। তিনি ৩০০ জন আনসার নিয়ে চুয়াডাঙ্গা চলে আসেন। এ যুদ্ধে বড় জয় অর্জিত হলেও অনেকে শহিদ হন। তাদের মধ্যে দুজন আনসার হলেন হাসমত আলী ও আবদুল কুদ্দুস। পরে শহিদ হন আনসার কমান্ডার ফজলুল হক। প্রতিরোধযুদ্ধে রাজশাহীর আনসাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২৭ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা শহরে টহল দিতে বের হলে আনসাররা তাদের উপর আক্রমণ করে। ওই দিন পুলিশলাইন আক্রান্ত হলে পুলিশ, জনতা, মুজাহিদ ও আনসাররা মিলে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনারা পুলিশলাইন দখল করে নেয়। ৬ এপ্রিল একযোগে পাকিস্তানি সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা শহর দখল করে। এই সম্মিলিত আক্রমণে বিশেষভাবে যুদ্ধ করে আনসার বাহিনীর সদস্যরা। নওগাঁ জেলার সহকারী আনসার অ্যাডজুটেন্ট আ.ক.ম. হুমায়ুন মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন। সেখানে আনসার ছিল প্রায় দেড়শ জন।

নাটোরের প্রতিরোধযুদ্ধ বিশেষভাবে স্মরণীয়। এখানে মহকুমা আনসার অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন সৈয়দ হাবিবুল বারী। এখানে শীতকালীন প্রশিক্ষণে দুইশ গুলি খরচ করার সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কম গুলি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়। ২৭ মার্চ ২৫তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি বড় পাকিস্তানি সেনাদল রাজশাহীর দিকে অগ্রসর হয়। তাদের যে কোনো উপায়ে প্রতিরোধ করার জন্য আনসারদের সহায়তা চাওয়া হয় সৈয়দ হাবিবুল বারীর কাছে। তিনি আনসার অফিসার মিয়া আতাহার আলী, জাহিদুল হাকীম, আবদুর রশিদ প্রমুখের সাথে আলাপ করে প্রায় চারশ ‘আনসার ও আট-দশ জন অফিসার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

পাবনা থেকে রাজশাহী যাওয়ার রাস্তার কাছে মুলাডুলিতে অ্যাম্বুশ করে তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করে। পাকিস্তানি সেনারা গোপালপুর হয়ে রাজশাহী যাওয়ার চেষ্টা করলে কমান্ডার ইউনুসের নেতৃত্বে দুই প্লাটুন আনসার আগেই গোপালপুর পৌছে জনগণের সাথে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে। পাকিস্তানি সেনারা ব্যারিকেড সরানোর সময় আনসারদের অতর্কিত আক্রমণে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এখানে প্রায় ৩৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় এবং পাকিস্তানি মেজর আসলাম আহত অবস্থায় আনসারদের হাতে ধরা পড়ে। এটা ছিল খুব বড় ধরনের সাফল্য। এছাড়া নাটোরের আরও একটি প্রতিরোধ ছিল বীরত্বব্যঞ্জক।

১৭ এপ্রিল বিধ্বস্ত আনসাররা নাটোরের আনসার কমান্ডার মো. তৈমুরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সাঁজোয়া বহরকে অসম শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ করে। নাটোর-রাজশাহীর মাঝখানে ঝলমলিয়ায় এই প্রতিরোধে চারজন আনসার শহিদ হন। কমান্ডার মো. তৈমুরকে আটক করে প্রথমে গুলি গায়ের উপর গাড়ি চালিয়ে হত্যা করা পাবনার প্রতিরোধযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন অ্যাডজুটেন্ট এম বরকত।

সার্বিক সহায়তা অভিযোগে তাঁকেসহ বহু আনসারকে প্যারেডে করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা হয়। বিবি হাই স্কুলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে দায়িত্ব আনসার মোল্লা একাত্তরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া-বাঘাবাড়ি ছিল গুরুত্বপূর্ণ জহুরুল হক এক আনসার নিয়ে এই পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধের করেন। তাড়াশের আনসার কমান্ডার রহমান ও তার দল হয়। সিরাজগঞ্জের আনসার কমান্ডার আলী, কাজীপুরের আনসার কমান্ডার তার উল্লাপাড়ার আনসার নিজ বাহিনী বৃদ্ধি করে। পাকিস্তানি বিমান আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ পড়ে।

১২ এপ্রিল একটি সম্মুখযুদ্ধে আনসার জহুরুল হন। দিনাজপুরের প্রতিরোধযুদ্ধেও আনসারদের অনেক হয়েছে। এখানে অ্যাডজুটেন্ট মহকুমা অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন ফজলুল অ্যাডজুটেন্ট খোন্দকার কাদের। স্বাধীনতার জোরালো অবস্থানে আনসাররা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে মুক্তিযুদ্ধ আগে থেকে দিনাজপুরের সীমান্তফাঁড়িগুলো সম্ভব একটি প্রশিক্ষণ ‘ক্রিস্টাল কর্মসূচিতে হয়। এতে ইপিআরদের সাথে অ্যাডজুটেন্ট মো. শরীফুল রাইফেল থাকায় নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই দিয়ে করায় একটি পাকিস্তানি দলকে শহরে হয়। পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও মহকুমার ছিলেন কবির আহমদ। মার্চের শুরুতে গড়ে ওঠা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর ছিল আনসার।

জন্য আনসারদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। এখানেও প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহের প্রধান সহায়তা আসে তাদের কাছ সংঘর্ষের সূত্রপাত সারা ইপিআরদের দখলে চলে আসে। বিশেষভাবে সহায়তা আনসার বাহিনী। এই কিশোরগঞ্জ হয়ে ওঠে। কিশোরগঞ্জ মহকুমার আনসার ছিলেন এম জামান। সহকারী আবদুল মতিয়ার আবদুল কাদের, আবদুল এম দ্দুস প্রমুখ। এখানেও গুরু দায়িত্ব উপর।

মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল একটা বিশেষ দখল আছে। শুরু করে শেষ টাঙ্গাইলের আনসাররা খুবই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপিত আনসার সাটিয়াচড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর আনসাররা এপ্রিল কালিহাতি ব্রিজের পাকিস্তানি সেনাদের উপর হামলায়ও তারা ছিল। হামলায় আবদুল খালেক এক আনসার শহিদ হন। সুনামগঞ্জের যে সকল যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় তাদের মধ্যে আনসাররা ছিল।

মার্চের মাঝামাঝি এখানে আনসার ক্লাব থেকে ৫০টি রাউফেল ও দুই হাজার রাউন্ড গুলি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এর কৃতিত্ব আনসার কমান্ডার আশ্রাব আলী ও নবাব আলীর। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধে শহিদ হন আনসার কমান্ডার আবুল হোসেন। তিনি সুনামগঞ্জের প্রথম শহিদ।”

নোয়াখালীতে আনসারদের সংগঠিত করেন জেলা আনসার অ্যাডজুটেন্ট এএসএম হাবীবুল্লাহ। নিজের উদ্যোগে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং প্রায় ৬০০ রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট হস্তান্তর করেন। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ায় এজন্য তাঁকে জীবন দিতে হয়। খুলনায় আনসার সদর দফতর ছিল ভূতের বাড়ি নামক স্থানে। ২৫ মার্চের পর তারা অস্ত্র ও গোলা-বারুদ নিয়ে শাহপুর, রংপুর, লতা থামার প্রভৃতি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। খুলনাতে আনসার বাহিনীর বিশেষ করে কারখানার সশস্ত্র আনসার প্রহরীরা ২৭ মার্চ ব্যাপক প্রতিরোধসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এখানে সাহসী অভিযান ছিল খুলনা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ।

এ অভিযানে কয়েকজন আনসার সদস্য ছিলেন। আক্রমণে ব্যবহৃত অস্ত্রের অধিকাংশই বাগেরহাট জেলা আনসার অ্যাডজুটেন্টের সহায়তায় সংগ্রহ করা হয়। খুলনা বেতার কেন্দ্র আক্রমণে মোসলেম নামে এক আনসার শহিদ হন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ সব স্থান ছাড়াও রাজবাড়ি, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ফেনী, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশালসহ সর্বত্র আনসার বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্নভাবে যুক্ত হয়। প্রতিরোধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের অংশগ্রহণ শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনীর বিশেষ অবদান :

বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে। ১৭ এপ্রিল বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় মন্ত্রিসভার অভিষেক। সঞ্চালক ছিলেন আবদুল মান্নান। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে আনসার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। একই সাথে তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবউদ্দিন আহমেদের পরিচালনায় প্রাথমিকভাবে মুক্তিফৌজ নামে পরিচিত স্থানীয় আনসারদের একটি দল মন্ত্রিসভার গার্ড অব অনার কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। ”

এ দলের আনসারদের মধ্যে ছিল মীর ইয়াদ আলী, আরজউল্লাহ, আজিমউদ্দিন, সাহেব আলী, অস্থির মল্লিক, লিয়াকত আলী, ফকির মোহম্মদ হামিদুল হক, নজরুল ইসলাম, মফিজউদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, মো. কিসমত আলী ও আরশাদ আলী। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আনসারদের এই অংশগ্রহণ উজ্জ্বলতম ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। আনসার বাহিনীর একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ায় বিপাকে পড়ে পাকিস্তানি সরকার।

১৯৭১ সালের জুন মাসে ১৯৫৮ সালের আনসার অ্যাক্ট বাতিল করে লে. জেনারেল টিক্কা খান ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ৭১’ জারি করে। এর ফলে পক্ষ ত্যাগ না করা আনসাররা রাজাকার বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭১-এর মে মাসে মাওলানা এ.কে.এম. ইউসুফ ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে খুলনায় আনসার ক্যাম্পে রাজাকার বাহিনী গঠন করে। পরবর্তীকালে অর্ডিন্যান্সে এই রাজাকার নাম গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সাত কোটি বাঙালির একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া সকলের কিছু না কিছু আত্মত্যাগের অবদান রয়েছে।

এর সাথে যুক্ত ছিল সেনা, পুলিশ, আনসারদের মতো সশস্ত্রবাহিনীর অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আনসারের ১০ জন কর্মকর্তা, ৩ জন কর্মচারী এবং ৬৭০ জন সদস্য শাহাদাত বরণ করেন। তবে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত এ সংখ্যা অসম্পূর্ণ। অসীম সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য আনসারের শহিদ এলাহী বক্স পাটোয়ারীকে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। এছাড়া মো. গোলাম ইয়াকুব এবং শহিদ ওয়ালিউল হোসেনকে বীর প্রতীক উপাধি প্রদান করা হয়।

প্রত্যেকের নিজস্ব অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার ক্ষেত্রটি অনেক বড়। সেখানে আনসারদের প্রায় ৪০ হাজার রাইফেল এবং গোলাবারুদসহ তাদের বহু সংখ্যক সদস্যের প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিসংগ্রামে যোগদান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়।

আরও পড়ুন:

তথ্যনির্দেশ:

১. শেখ গাউস মিয়া, মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী, ঢাকা, জনপ্রিয় প্রকাশনী, ২০০৯, পৃ. ২২

২. মো. শরীফুল হক, স্মৃতি অমলিন, ঢাকা, রুমানা হক, ১৯৯৮, পৃ. ১৭

৩. মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী, পৃ. ২৯

8. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮

৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯

৬. মো. জহুরুল হক, আমার স্মৃতিতে আনসার, ঢাকা, সোনারগাঁও প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশনস, ১৯৯৩, পৃ. ৮২

৭. রাও ফরমান আলী খান, অনুবাদ: শাহ আহমদ রেজা, বাংলাদেশের জন্ম, ঢাকা, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯৬, পৃ. ৮০

৮. এএসএম সামভুল আরেফিন (সম্পা.), মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা, ঢাকা, পুলিশ হেড কোয়ার্টাস, 2000, পৃ. 20

৯. আমার স্মৃতিতে আনসার, পৃ. ৮৭

১০. Siddiq Salik, Witness to Surrender (Dhaka. The University Press Ltd. 1979) P. 230

১১. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯, পৃ. ২০৫

১২. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (সম্পা.), মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯, পৃ. ৬৯

১৩. মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী, পৃ. ৫৮

১৪. মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী, পৃ. ৬১

১৫. সাক্ষাৎকার: মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, নবম খণ্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮৪, পৃ. ৩৩৩

১৬. মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৬৩

১৭, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬

১৮. মো. মাহবুবর রহমান ও মীর ফেরদৌস হোসেন, মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী, ঢাকা, সুবর্ণ, ২০১৩, পৃ. ৩৮ ১৯ [[[[৫৯]

Leave a Comment