বাউল কবি ও তত্ত্ব প্রসঙ্গ – আহমদ শরীফ

বাউল কবি ও তত্ত্ব প্রসঙ্গ – আহমদ শরীফ : স্বকালের জীবনপ্রবাহের গতি-প্রকৃতির কথা সমকালের মানুষ গানে-গাথায়-চিত্রে স্থাপত্যে-ভাস্কর্যে কিংবা স্মৃতিকথায় ধরে না রাখতে তা চিরতরে হারিয়ে যায়। পরে আর শতচেষ্টায়ও তা কায়া-প্রতীক হয়ে উঠে না, মায়া ও ছায়া হয়ে জিজ্ঞাসুকে কেবল বিভ্রান্তই করে। কল্পনা ও অনুমান যোগে সত্য নির্ধারণের প্রয়াসে তাই কোনো দুই ব্যক্তি একমত হতে পার না। একারণেই অতীত সম্বন্ধে প্রাতিভাসিক সত্য ও তথ্য নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে বিতর্ক-বিবাদ চলতেই থাকে সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসা থাকে চিরঅনায়ত্ত।

বলতে গেলে অক্ষয়কুমার দত্ত ব্যতীত উনিশ শতকে কেউ বাউল মত ও সম্প্রদায় সম্বন্ধে আগ্রহী ছিলেন না। অক্ষয় দত্তও বিভিন্ন শাখার বাউল মতের সংক্ষিপ্ত সাধারণ অস্তিত্বের কথাই কেবল লিখেছিলেন। তা যে বাঙলার ও বাঙালীর নিজস্ব ধর্ম-সে সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন না। বিশ শতকে প্রতিভাবান লোক-কবি লালনের প্রতি আকর্ষণবশেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর কয়েকটি গান ‘হারামণি’ নামে প্রবাসীতে প্রকাশিত করেন। তারপর থেকেই লালন ও লোকগীতি সম্পর্কে কোনো কোনো বিদ্বানের কৌতূহল জাগে। এভাবেই ক্রমে লালনচর্চা ও বাউলমত আলোচনার শুরু। পাকিস্তান আমলে লালনকে মুসলমান বানিয়ে গৌরব-গর্বের অবলম্বন করবার অপপ্রয়াসে বাউলতত্ত্ব, বাউলকবি ও বাউলগান বহুল ও প্রায় নিত্য আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

পঞ্চাশোর্ধ্বকাল ধরে বহুলোকের চর্চার ফলে তথ্য ও তত্ত্ব বহুল ও বিপুল হয়ে উঠেছে এবং তা-ই প্রায় অসাধ্যরূপে জটিলও হয়েছে। কাজেই সমস্যাও পূর্ববৎ প্রবল। প্রতিজ্ঞায় (Promise-এ) প্রমাদ থাকলে সিদ্ধান্ত নির্ভুল হতেই পারে না।

 

বাউল কবি ও তত্ত্ব প্রসঙ্গ : মূল সমস্যা চারটি :

ক. বাউল নামের উৎপত্তি নিরূপণ

খ. বাউল মত নির্ণয়

গ. লালনের জাতি পরিচয়

ঘ. লালনের জন্মস্থান নির্দেশ।

এসব সমস্যার সমাধানের পথে তথ্য-প্রমাণের বিভ্রান্তি যত-না আছে, তার চেয়ে বেশি প্রতিবন্ধক রয়েছে আলোচক-গবেষকের মানসপ্রবণতায়। ‘বাউল’ নামের উদ্ভব ও ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে এযাবৎ যাঁর যেমন ইচ্ছা তেমনি মত ব্যক্ত করেছেন। সম্ভাব্য সব রকমের অনুমানের আকর প্রায় নিঃশেষ। তবু মীমাংসা হল না।

বাউলমতকেও কেউ যোগ, কেউ তন্ত্র, কেউবা সাংখ্যসম্ভূত বলে অনুমান করেন, কেউবা সুফিমত বলে চালিয়ে দেন। আবার কেউ কেউ একে একটি মিশ্রমত বলে আপস খোঁজেন। সম্প্রতি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাঙলাদেশ’ জার্নালে (এপ্রিল ১৯৭৩ সন) ডক্টর হরেন্দ্রচন্দ্র পাল ‘চারিচন্দ্র-তত্ত্বের উৎস কোরআনের আয়াত বলে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া জন্ম-সূত্রে বৌদ্ধ, শৈব বা বৈষ্ণব সংলগ্নতার দাবি তো রয়েইছে । বাউলমতের প্রবর্তক হিসেবে পাই চৈতন্যদেব, নিত্যানন্দ, বীরভদ্র, আউলচাঁদ, মাধববিবি প্রভৃতিকে।

গোড়াতে লালনের জাতিপরিচয় সম্পর্কে একটি আপসমূলক সিদ্ধান্ত চালু ছিল লালনের জন্ম হিন্দুর ঘরে আর পালন মুসলিম সংসারে এবং পোষণ হিন্দু-মুসলিমে মিশ্রিত বাউলসমাজে। ইদানীং তাঁকে শুদ্ধ মুসলমান কিংবা কেবল হিন্দু বানাবার জোর প্রয়াস চলছে। এ শতকের গোড়ার দিকে ওহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের প্রভাবে বাউলদের দেখা হত মুসলিম সমাজের লজ্জা, দায় ও বোঝারূপে। ইসলামের নামে বাউলবিরোধী ও বিধ্বংসী ফতোয়া বের হল— লাঞ্ছিত হল কত বাউল। এখন লালন শাহর প্রতিভামুগ্ধ ও লোকসাহিত্যের ঐশ্বর্যগর্বী বিদ্বানেরা বাউলমত, বাউলকবি ও বাউলগানকে সম্পদরূপে বিবেচনা করেন, তাই শুরু হয়েছে দাবি-প্রতিষ্ঠার লড়াই।

জন্মস্থানের অধিকার নিয়েও তাই শুরু হয়েছে সংগ্রাম-ছেউড়িয়ায়, ভাঁড়ারায় ও হরিশপুরে। এ সংগ্রামে প্রযুক্ত অস্ত্র হচ্ছে শতোর্ধ্ব বয়সের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, লালনের জ্ঞাতি, ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ের কবলা এবং রাজস্বের ও স্বত্ত্বের মামলার দলিল। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে অব্যর্থ প্রমাণক বলেই মনে হয়। কিন্তু সমকালে ‘লালন’ নামের একাধিক মানুষের অস্তিত্বের সম্ভাবনা, অশিক্ষিত মানুষের বয়সের হিসেবে ত্রুটি, জ্ঞাতিত্বে প্রমাণের অভাব, দলিল-দস্তাবেজে নামগত সাদৃশ্যজাত বিভ্রান্তির সম্ভাব্যতা প্রভৃতি প্রশ্ন সদুত্তরের অপেক্ষা রাখে। সম্প্রতি দুদ্দুশাহ রচিত লালনের জীবনপরিচিতি মিলেছে। আমিও অধ্যাপক এস.এম. লুৎফর রহমানের কাছে এর প্রতিলিপি দেখেছি। দুদ্দুশাহ নিজে গান বাঁধতেন। ঐ রচনার ভাষায় ও ছন্দে স্বভাবকবির স্বাচ্ছন্দ্য নেই।

শব্দবিন্যাসে ও প্রয়োগে এবং ছন্দে ত্রুটি সর্বত্র দৃশ্যমান। তাছাড়া সাক্ষর দুদ্দুশাহ নিজের বাঁধা গান কখনো খাতায় লিখে স্থায়িত্বদানের চেষ্টা করেছেন বলে প্রমাণ নেই। তিনি হঠাৎ ৭০-৮০ চরণে লালনগুরুর জীবন-কথা লিপিবদ্ধ করতে গেলেন কোন্ প্রেরণায়? লালন সম্পর্কে আধুনিক বিদ্বানদের যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই মেলে উক্ত দদ্দুরচিত জীবনচরিতে। এতেই এর যথার্থ্য সম্বন্ধে জাগে প্রশ্ন। অথচ বহু শিষ্যের সিদ্ধগুরু ও গানের রাজা লালন-জীবনের নানা লৌকিক-আলৌকিক কাহিনীর বর্ণনা থাকা ছিল প্রত্যাশিত। এতেই এর অকৃত্রিমতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রবল হয়। সরকার যেমন শাসনের প্রয়োজনে অসত প্রচারে আগ্রহী থাকে, গবেষকরাও তেমনি সত্য উদঘাটনের নামে মানসপ্রবণতার প্রতি সোহাগবশে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে পছন্দসই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

আমি নিজেও একসময় বাউলতত্ত্ব, বাউলগান ও লালন সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করেছি। আজ মনে হয় সেসব তথ্য ও তত্ত্বের সবটা যথার্থ নয়। আমার এখনকার ধারণা : বাউলমত বাঙলার ও বাঙালীর মৌলিক ধর্ম। মঙ্গোলীয় তথা ভোটচীনা রক্তে সঙ্কর ও ভোটচীনা পরিবেষ্টিত ও প্রভাবিত অস্ট্রিক বাঙালীর মানস-প্রসূন এই ধর্ম। আমাদের ভুললে চলবে না যে, বাঙালী মুখে বহির্দেশীয় ধর্ম ও দর্শন গ্রহণ করেছে বটে, কিন্তু নিজের জীবন-জীবিকার অনুকূল না হলে তা কখনো বুকের সত্য কিংবা মর্মের তত্ত্বরূপে বরণ করেনি। তাই এখানে বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও ইসলাম বিকৃত হয়েছে।

বাঙালী সাংখ্যসম্মত যোগতন্ত্রভিত্তিক জীবনচর্যা গ্রহণ করে নামসার বৌদ্ধমতের আবরণে। কালক্রমে তারই বিবর্তিত রূপ পাই বজ্র-সহজ কালচক্র-মন্ত্র প্রভৃতি বিকৃত বৌদ্ধযানে বা মতে। দেহতাত্ত্বিক এই নাস্তিক্য সাধনার জয় রয়েছে দেহতাত্ত্বিক ঐ নাস্তিক চর্যায় ও ভোটচীনার তন্ত্রাচারে। বস্তুত অস্ট্রো-মোঙ্গল সংস্কৃতির প্রসূন ঐ কায়াভিত্তিক জীবনসত্য ও জগত্তত্ত্ব বাঙালীচিত্তে বজ্রসত্ত্ব কালতত্ত্ব সহজানন্দ শূন্যরূপে বিশিষ্ট বা অনন্য দৈশিক রূপ লাভ করে। একসময় তা হয়তো নিরক্ষর নির্জিত সমাজে জনপ্রিয় হয়ে সর্বভারতীয় হয়ে উঠে। গোরক্ষনাথীর ও কবীরপন্থীর চর্যার সঙ্গে তাই এর সাদৃশ্য খুঁজে পাই।

ব্রাহ্মণ্য অভ্যুত্থানে বৌদ্ধ-বিলুপ্তির সময়ে নির্যাতিত বৌদ্ধনামধেয় উক্ত বজ্র সহজযানীরা ব্রাহ্মণ্য সমাজে আত্মগোপন করে এবং অনতিকাল পরে আত্মরক্ষার গরজে ইসলামাশ্রিত হয়। তখন নবধর্মের আচারিক প্রভাবের প্রাবল্যে অত্যুৎসাহী শাস্ত্রকারদের শাসনে তারা সাধারণত প্রকাশ্যে স্বধর্মাচরণ বন্ধ রেখেছিল, তারপর ব্রাহ্মণ্যবাদী ও মুসলিমদের প্রাথমিক উৎসাহে শৈথিল্য এলে ওরা স্বধর্মাচরণে সাহসী হয়ে ওঠে।। মাঝখানের দুশো-আড়াইশো বছরের স্তব্ধতা ও আংশিক বিরতি নিরক্ষর নির্জিত গণমানবের আত্মপরিচয়ে বিস্মৃতি ঘটায়। এর ফলেই চৌদ্দ-পনেরো শতকে বাউল সম্প্রদায় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও শাস্ত্রবিরহী ভূঁইফোড় হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে ‘বাউল’ নামের ও মতের উদ্ভব নিরূপণে পণ্ডিতে পণ্ডিতে লড়াইয়ের সুযোগ ঘটেছে।

আমার এখনকার ধারণা ‘বজ্রকুল’ থেকেই কালে ‘বাউল’ শব্দের উদ্ভব এবং বজ্র সহজযানী থেকে নাথশৈব, যোগী, বৈষ্ণব সহজিয়া ও বিভিন্ন গুরুবাদের বেনামে হিন্দু মুসলিম বাউলসম্প্রদায়গুলোর বিকাশ কিংবা বিকৃতি ঘটেছে। মধ্যখানে ব্রাহ্মণ্যসমাজ, ইসলাম ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত আশ্রিত হয়েছিল বলে তাদের মধ্যে আস্তিক্যবোধ ও অধ্যাত্মবুদ্ধি দৃঢ়মূল হয়েছে। এবং তা রাধাকৃষ্ণ, মায়া-ব্রহ্ম, আল্লাহ-মুহম্মদ, শিব-শক্তি, নাথ-শূন্য প্রভৃতি নানা আরাধ্যের রূপকে কোরআন-পুরাণাশ্রিত হয়েছে। বিদ্বানদের বিভ্রান্ত হবার কারণও ঘটেছে এভাবেই। নইলে এরা পূর্বাপর দেহাত্মবাদীই দেহাধারেই প্রাণপুরুষের পরশপ্রয়াসী।

এক তত্ত্ব সম্বন্ধেই তারা জিজ্ঞাসু—–—সেটি হচ্ছে দেহতত্ত্ব। নাস্তিক্য সাংখ্যযোগতন্ত্রই এ তত্ত্বের উৎস, বারোশতকের ‘অমৃতকুণ্ড’, চর্যাগীতি, প্রাণ-সঙ্কলি, হাড়মালা, সাধনমালা প্রভৃতি যোগ ও তন্ত্র বিষয়ক গ্রন্থ কিংবা বিবর্ত বিলাস প্রভৃতি সহজিয়া বৈষ্ণবগ্রন্থগুলোর আলোকে বাউলমত বোঝা কঠিন নয়। যা বললাম তার জন্যে পাথুরে প্রমাণ পেশ করতে পারব না, তবে এই অনুমানে গবেষণা করলে বোধহয় আমরা সত্যের সন্ধান পেয়েও যেতে পারি।

বাউল ও লালন সম্বন্ধে সম্প্রতি অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে। ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক আবু তালিব বিপুলকায় গ্রন্থ রচনা করেছেন, অধ্যাপক আনওয়ারুল করীম, অধ্যাপক খোন্দকার রিয়াজুল হকের বইও ছোট নয়। অধ্যাপক এস. এম. লুৎফর রহমান এবং আবুল আহসান চৌধুরীর গ্রন্থও প্রকাশনের পথে। রবীন্দ্রনাথ, ক্ষিতিমোহন সেন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, সতীশচন্দ্র দাস, করুণাময় গোস্বামী, ভোলানাথ মজুমদার, বসন্তকুমার পাল, শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, ডক্টর মতিলাল দাস, পীযূষকান্তি মহাপাত্র, ডক্টর মযহারুল ইসলাম, এ. এইচ. এম. ইমামুদ্দীন, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর প্রভৃতি অনেকেই নানাভাবে বাউলগান ও বাউলকবি সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন ও করবেন। তত্ত্ব কিংবা পুরাতত্ত্ব বিষয়ে কেউ কখনো শেষ কথা বলতে পারে না। বিতর্কে-বিবাদে-বিসম্বাদে প্রতিবাদী গবেষণা ও আলোচনা চালু রাখাই হচ্ছে জ্ঞানচর্চা। আনুষঙ্গিকভাবে আসে নতুন তথ্য, তত্ত্ব ও তাৎপর্য। এভাবেই মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশ ও প্রসারলাভ করেছে।

 

লালন ভক্ত কথা বলেছেন লালন দর্শন নিয়ে:

Leave a Comment